প্রেমের সংলাপ ১৪
জানালার পাশে রাখা প্রেম
– কিশোর মজুমদার
রুদ্র:এই শহরটা আজ আবার ভিজছে চয়নিকা। রাস্তায় রাস্তায় জল জমে আছে, কিন্তু আমার ভেতরে জমে আছে তোমাকে না বলা কত কথা।তোমার এক চিমটি হাসিতে যেন সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে যায়— ঠিক দুপুরের রোদে হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো।
চয়নিকা: তুমি সবকিছুতেই আমাকে খুঁজে পাও কেন? আকাশে তাকাও—আমাকে দেখো, বৃষ্টির শব্দ শোনো—আমার নাম ডাকো। আমি তো শুধু নীরবে হাঁটি শহরের ভেজা ফুটপাথে।
রুদ্র: নীরবতাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভাষা। হাজারো না বলা কথা শব্দ ছাড়াই কেমন করে বুকের ভেতর বাজে! তুমি শুধু হাতটা ধরো, আমি নীরবতার মানে পড়ে নেব।
চয়নিকা: সময় বদলাবে রুদ্র। আমাদের গায়ের রঙ চটবে, মুখে জমবে বয়সের নরম ভাঁজ। তখনও কি তুমি আমার এই কাঁপাকাঁপা হাতটা ধরেই থাকবে?
রুদ্র: পুরো পৃথিবী উল্টো হয়ে যাক না, তাতে কী আসে যায়? তোমার বুকের বাম পাশটাই তো আমার চিরস্থায়ী শান্তির ঠিকানা। এই ঠিকানা বদলায় না, চয়নিকা।
চয়নিকা: কখনো কখনো ভয় হয়। ভয় হয়, একদিন হয়তো তোমার চোখে আমি আর আগের মতো ঝলমল করবো না।
রুদ্র: ঝলমল কমে গেলে কী হয়েছে? আলো কমলেই তো তারা বেশি দেখা যায়। তুমি কোনো মানবী নও, চয়নিকা— তুমি যেন কোনো কবির অসমাপ্ত কবিতার শ্রেষ্ঠ অন্তরা, যাকে আমি রোজ রোজ মনে মনে পূর্ণ করি।
চয়নিকা: আজ আকাশটা দেখেছো? এত মেঘ, এত নীল… মনে হচ্ছে আমার কপালে একটা কালো টিপ দিলে
আকাশটা আরও নীল হয়ে উঠতো।
রুদ্র: তোমাকে নীল শাড়িতে দেখলে আকাশটাও যেন ঈর্ষায় নীল হয়ে যায়। আর তোমার চোখের ওই কাজল… জানো, ওর ওপর আমার খুব হিংসে হয়। ও তোমার এত কাছে থাকে— আমি পারি না।
চয়নিকা: এই ঈর্ষাটুকুই কি ভালোবাসা?
রুদ্র: না, ভালোবাসা হলো চায়ের কাপে তোমার আঙুলের ছোঁয়া, আর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তোমার সেই মৃদু হাসি। এইটুকুই আমার বেঁচে থাকার রসদ।
চয়নিকা: আজ এত বৃষ্টি হচ্ছে… তুমি ভিজছো না?
রুদ্র: আমি ভিজি স্মৃতিতে। প্রতিটা বৃষ্টির ফোঁটা তোমার নাম জপ করে পড়ে। শহর যখন বৃষ্টির ছন্দে মেতে ওঠে, আমি তখন তোমার হাসির স্মৃতিতে ভিজি।
চয়নিকা: যদি একদিন এই স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে যায়?
রুদ্র: তবুও তোমাকে চিনে নেবো নীরবতায়। তোমার নিঃশ্বাসের শব্দে, তোমার হাতের উষ্ণতায়। সময় আমাদের ছুঁতে পারবে, কিন্তু ভেঙে দিতে পারবে না।
চয়নিকা: তাহলে থাকো। শব্দে নয়, প্রতিশ্রুতিতে নয়— শুধু থাকো।
রুদ্র: থাকবো। বৃষ্টির মতো নিঃশব্দে, জানালার পাশে বসে থাকা আলোর মতো, তোমার বুকের বাম পাশটায় চিরদিনের মতো। ……………………………
