নক্ষত্রের অক্ষরে হৃদয়ের ছন্দ । প্রেমের সংলাপ ১১। – কিশোর মজুমদার

নক্ষত্রের অক্ষরে হৃদয়ের ছন্দ । প্রেমের সংলাপ ১১। – কিশোর মজুমদার

[রুদ্র এবং চয়নিকার প্রেম যেন এক বৈপরীত্যের মিলন। রুদ্র কবি, যার জগৎ জুড়ে শব্দ আর কল্পনা; অন্যদিকে চয়নিকা উচ্চশিক্ষিত, বাস্তববাদী এবং বুদ্ধিমতী।রুদ্র: একজন আবেগপ্রবণ কবি। জিন্সের সঙ্গে পাঞ্জাবি আর এলোমেলো চুল তার পরিচয়। চয়নিকা এম.বি.এ এবং ডেটা সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করা এক কর্পোরেট পেশাদার। ফিটফাট, চশমা চোখে এবং অসম্ভব বাস্তববাদী। তাদের এই চিরচেনা মান-অভিমানের একটি কাল্পনিক সংলাপ নিচে দেওয়া হলো। ডুয়েট পাঠের জন্য এই রসসিক্ত সংলাপ একেবারে উপযুক্ত। ]

নক্ষত্রের অক্ষরে হৃদয়ের ছন্দ

– কিশোর মজুমদার

(স্থান: শহরের একটি পুরনো বাড়ির ছাদ। রাত ১টা। দূরে শহরের নিয়ন আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ছাদটা অন্ধকার। রুদ্র একটা আলগা ইটের ওপর বসে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু ধরার চেষ্টা করছে। চয়নিকা একটি ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আইপ্যাডের নীল আলোয় ডুবে আছে। তার পাশে রাখা কফির মগ।)


রুদ্র : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে, গলার স্বরে একরাশ বিষণ্ণতা) দেখেছো চয়নিকা ? ওই যে চাঁদটা আজ কেমন ম্লান হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। ঠিক যেন কোনো এক পরিত্যক্ত রাজপ্রাসাদের বিষণ্ণ রাজপুত্র, যার সিংহাসন নেই, রাজ্য নেই—আছে শুধু অন্তহীন হাহাকার। ওর এই ম্লান হাসিতে কত সহস্র প্রেমিকের না-বলা দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে, তুই কি শুনতে পাচ্ছো ?


চয়নিকা : (এক মুহূর্তের জন্য চোখ না তুলেই আইপ্যাডে স্লাইড সোয়াইপ করল) ওটা ম্লান নয় রুদ্র, ওটা স্রেফ ‘অ্যালবেডো ইফেক্ট’ (Albedo effect)। সূর্যের আলো প্রতিফলন করার ক্ষমতা আজ হয়তো বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণা বা আর্দ্রতার জন্য ৫-১০ শতাংশ কমেছে। আর রাজপুত্র? দয়া করো রুদ্র! ওটা স্রেফ একটা পাথুরে উপগ্রহ, যার না আছে নিজস্ব আলো, না আছে প্রাণ। ওখানে বায়ুমণ্ডল নেই বলে শব্দ তরঙ্গ চলাচল করতে পারে না। তাই তোমার ওই ‘দীর্ঘশ্বাস’ ওখানে পৌঁছালে ভ্যাকুয়ামে ফেটে যেত।


রুদ্র : (হেসে উঠে দাঁড়াল) তু্মি কি জানো চয়ন, তোমার এই যুক্তিগুলো ঠিক যেন ওই দূরবীনের মতো ? দূরের সুন্দর জিনিসটাকে টেনে হিঁচড়ে কাছে এনে তার দাগগুলো স্পষ্ট করে দাও। তু্মি জ্যোৎস্নাকে মাপো লাক্স মিটারে, আর আমি মাপি হৃদস্পন্দনে। তুমি চাঁদকে দেখো পাথরের ঢেলা, আর আমি দেখি মানস প্রতিমা। তোমার কাছে যা মহাজাগতিক বর্জ্য, আমার কাছে তা অনুপ্রেরণা।


চয়নিকা : (আইপ্যাড বন্ধ করে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করল) কারণ আমি বাস্তবকে অস্বীকার করি না। হৃদস্পন্দন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় তবে সেটা প্রেম নয় রুদ্র, ওটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ট্যাকিকার্ডিয়া’ (Tachycardia)। পৃথিবীটা তোমার ওই কাল্পনিক রূপক বা ছন্দে চলে না, চলে ফিজিক্স আর ইকোনমিক্সের কড়া নিয়মে। তু্মি চাঁদে কলঙ্ক দেখো কারণ তুমি খুঁত খুঁজতে ভালোবাসো, আমি দেখি ক্র্যাটার বা গর্ত—যেগুলো প্রমাণ করে চাঁদ কত প্রতিকূলতা সহ্য করে টিকে আছে।


রুদ্র : (ধীরে ধীরে চয়নিকার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। চয়নিকা থমকে গেল।) আচ্ছা ম্যাডাম সায়েন্টিস্ট, লজিক তো তোমার নখদর্পণে। তাহলে বলো তো, এই যে আমি তোমার ঠিক দশ ইঞ্চি দূরত্বে এসে দাঁড়ালাম, আর তোমার নিশ্বাসের শব্দ আমার কবিতার ছন্দের চেয়েও বেশি দ্রুত হয়ে গেল, তোমার কপাল বেয়ে একবিন্দু ঘাম নামল—এটার পেছনে কোন ফিজিক্স কাজ করছে ? এটাও কি বায়ুমণ্ডলের চাপ ?


চয়নিকা : (খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল) এটা… এটা স্রেফ একটা বায়োলজিক্যাল রেসপন্স। একে বলে ‘অ্যাড্রেনালিন রাশ’। হঠাৎ কোনো স্টিমুলাস কাছে এলে আমাদের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম রিঅ্যাক্ট করে। নিউরোট্রান্সমিটারগুলো একটু বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে, দ্যাটস ইট!


রুদ্র : (একটু ঝুঁকে চয়নিকার চোখের দিকে তাকিয়ে) মিছে কথা। একেবারে ডাহা মিথ্যে! এই মিথ্যেটা বলার সময় তোমার চোখের মণি যেভাবে কাঁপল, সেটা কোনো ল্যাবরেটরির সেন্সরে ধরা পড়বে না চয়নিকা। ওটা স্রেফ আমার মতো কোনো পথহারা কবির খাতা আর কলমে ধরা দেবে। তুমি যুক্তি দিয়ে পৃথিবী জয় করতে পারবে, বড় বড় কোম্পানির গ্রাফ চার্ট মেলাতে পারবে, কিন্তু আমাকে পেতে গেলে তোমাকে ওই চাঁদের কলঙ্কটাকেও ভালোবেসে বুকে টেনে নিতে হবে। অংকের বাইরেও যে জীবন থাকে, সেটা কি তোমার কোনো অ্যালগরিদমে লেখা আছে ?


চয়নিকা : (একটু শান্ত হয়ে) অংকের বাইরে জীবন মানেই কি বিশৃঙ্খলা রুদ্র ? তুমি বলছো আমি নক্ষত্র গুনি লাভ-ক্ষতির হিসেব করতে, কিন্তু তুমি কি জানো এই নক্ষত্ররাই বলে দেয় আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি ? নেভিগেশন ছাড়া তো তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।


রুদ্র : আমার কোনো গন্তব্য নেই চয়নিকা। আমি তো এক যাযাবর শব্দশ্রমিক। আমি নক্ষত্র দেখি পথ চেনার জন্য নয়, নক্ষত্র দেখি এটা বোঝার জন্য যে—এত বড় মহাবিশ্বে আমরা কত একা, আর এই একাকীত্বে তুমি আমার পাশে আছো বলেই আমার অস্তিত্ব পূর্ণ। তুমি কি পারো না তোমার ওই ডেটা শিটটা একপাশে রেখে স্রেফ পাঁচ মিনিটের জন্য ওই তারার পানে চেয়ে কোনো রূপকথা ভাবতে ?


চয়নিকা : (মৃদু হেসে) রূপকথা? যেমন ধরো, ওই যে নক্ষত্রটা দেখছো—ওটা আসলে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। ওটা হয়তো অনেক আগেই মরে গেছে, কিন্তু তার আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। এটাও কি তোমার জন্য রোমান্টিক? একটা মৃত নক্ষত্রের আলোর পেছনে আমরা ছুটে বেড়াচ্ছি ?


রুদ্র : (উত্তেজিত হয়ে) এটাই তো চরম রোমান্টিকতা! যে নেই, তার আলোও আমাদের পথ দেখাচ্ছে। প্রেমেও তো তাই হয়। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো এই মৃত নক্ষত্রের আলোর মতো আমাদের বাকি জীবনটা উজ্জ্বল করে রাখে। চয়নিকা, তুমি যেটাকে ডেথ অব আ স্টার বলছো, আমি সেটাকে বলছি অমরত্ব। তুমি বলছো দূরত্ব, আমি বলছি সংযোগ।


চয়নিকা : (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তু্মি ধুলোবালিকেও আবির বানিয়ে দিতে পারো। আচ্ছা, ধরো আমাদের বিয়ে হলো। মাসকাবারি বাজার করার সময় তুমি কি দোকানদারকে চালের বদলে চার লাইন কবিতা শোনাবে ? তখন তোমার এই ‘মৃত নক্ষত্রের আলো’ দিয়ে কি গ্যাস সিলিন্ডার কেনা যাবে ?


রুদ্র: (হেসে ফেলে চয়নিকার হাতটা আলতো করে ধরে) চাল কেনা যাবে না হয়তো, কিন্তু চাল সেদ্ধ করার সময় যে একঘেয়েমি আসবে, সেটা কাটানোর জন্য আমার কবিতা তোমাকে হাসাবে। তু্মি যখন সংসারের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে যাবে, আমি তোমাকে নিয়ে ছাদে আসব। তুমি আমাকে জিডিপি-র পতন বোঝাবে, আর আমি তোমাকে বোঝা্বো ঝরা পাতার বিলাপ। বৈচিত্র্য তো এখানেই! তুমি পৃথিবীটাকে সচল রখো তোমার বুদ্ধি দিয়ে, আর আমি পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য রাখি আমার কল্পনা দিয়ে।


চয়নিকা: (হাতের ওপর রুদ্রর হাতের স্পর্শ অনুভব করে গলার স্বর নরম করল) তু্মি কি জা্নো রুদ্র, মাঝে মাঝে তোমার এই পাগলামিগুলোই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে ? সারাদিন লজিক আর ডেটার জঙ্গলে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন মনে হয়, কেউ একজন থাকুক যে আমাকে বলবে—’আজ তোমাকে নীল রঙের কৃষ্ণচূড়ার মতো লাগছে’, যদিও আমি জানি নীল কৃষ্ণচূড়া হয় না।


রুদ্র: (মুচকি হেসে) নীল কৃষ্ণচূড়া হয় না কারণ তু্মি সেটা লজিকে খোঁজো। আমার চোখে চোখ রেখে দেখো, আজ এই মাঝরাতের জ্যোৎস্নায় তুমি নীল শাড়ি পরেছো, তোমার ছায়াটা পর্যন্ত নীলাভ হয়ে আছে। এই যে কাল্পনিক নীল রংটা, এটাই তো আমাদের সম্পর্কের রসায়ন।


চয়নিকা: রসায়ন মানেই কিন্তু ‘বন্ডিং’ রুদ্র। আর বন্ডিং মানেই ইলেকট্রনের আদান-প্রদান। তুমি সারাক্ষণ নিচ্ছ, আর আমি সারাক্ষণ লজিক দিচ্ছি। আমাদের মধ্যে ব্যালেন্সটা থাকবে তো ?


রুদ্র: থাকবে। কারণ আমাদের ব্যালেন্সটা অংকের নয়, সংগীতের। গানের দুটি সুর যেমন আলাদা হয়েও একটা রাগ তৈরি করে, আমরাও তেমনি। তুমি যদি ‘স্থির বিন্দু’ হো, আমি তবে ‘চঞ্চল গতি’। তুমি জমি, আমি আকাশ।


চয়নিকা : (মুচকি হেসে আইপ্যাডটা দূরে সরিয়ে রাখল) আচ্ছা বাবা হার মানলাম। আজ তোমারই জিত। বলো, ওই রাজপুত্রের জন্য এখন কী করা উচিত ?


রুদ্র: কিছুই না। শুধু আমার পাশে বসো। কোনো কথা নয়, কোনো তত্ত্ব নয়। শুধু ওই চাঁদের ম্লান আলোয় ডুব দিয়ে আমরা দুজনে একটা নিঃশব্দ মুহূর্ত শেয়ার করব। যে মুহূর্তের কোনো গ্রাফ নেই, কোনো ফিউচার প্রজেকশন নেই—আছে শুধু ‘এখন’।


চয়নিকা: (রুদ্রর কাঁধে মাথা রেখে) ‘এখন’… অর্থাৎ প্রেজেন্ট টেন্স। যা ডেল্টা টাইম জিরো-র সমান। অদ্ভুত সুন্দর তো !


রুদ্র: (আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে) দেখো চয়নিকা, চাঁদটা এখন আর ম্লান লাগছে না। মনে হচ্ছে ও আমাদের দেখে হাসছে।


চয়নিকা: (চোখ বুজে) ওটা হাসছে না রুদ্র, ওটা রিফ্লেকশন। কিন্তু আজ ওটাকে হাসি হিসেবে মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই।


(চাঁদের আলোয় দুজনে ডুবে থাকে। দূরে কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডাকছে। রুদ্র গুনগুন করে নিজের লেখা কোনো এক কবিতার লাইন আওড়ায়, আর চয়নিকা প্রথমবারের মতো অংকের খাতা ভুলে সেই ছন্দে তাল মেলায়।)


রুদ্র: (একটু নিরাশ হয়ে) তুমি হার মানলে চয়নিকা ? নাকি আমার ওপর দয়া করলে ? তোমাকে এই ‘লজিক্যাল’ ল্যাবে আর বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না। তুমি তোমার কাজ শেষ করো, আমি বরং একাই ওই মরা নক্ষত্রের সাথে কথা বলি।


(রুদ্র উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু চয়নিকা তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। চয়নিকার চোখে এখন আর সেই আইপ্যাড-এর নীল আলোর প্রতিফলন নেই, সেখানে এখন আকাশের নক্ষত্ররা চিকচিক করছে।)


চয়নিকা: (গলার স্বরে এক অদ্ভুত মাধুর্য) কাজ তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে রুদ্র। আইপ্যাডটা স্রেফ একটা দেয়াল হিসেবে ধরে রেখেছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের জলটা দেখতে না পাও ।


রুদ্র: (বিস্মিত হয়ে) চোখের জল? কেন? আমি কি খুব বেশি আজেবাজে কথা বলে ফেলেছি ?


চয়নিকা: (মৃদু হেসে মাথা নাড়ল) আরে পাগল। তুমি যখন ওই ‘মৃত নক্ষত্রের আলোর’ কথা বললে, তখন আমার মনে হলো—সারাটা দিন আমি কী ভীষণ একটা যান্ত্রিক মরুভূমির মধ্যে থাকি। টার্গেট, ডেডলাইন আর ক্যালকুলেশনের ভিড়ে আমি তো ভুলে গিয়েছিলাম যে আমার মধ্যেও একটা আকাশ আছে। তুমি যখন আমার কাছে এসে দাঁড়ালে, তখন আমার হার্টরেট আসলেও বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেটা কোনো ‘অ্যাড্রেনালিন রাশ’ নয়, ওটা ছিল তোমার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়।


রুদ্র: ধরা পড়ে যাওয়া ?


চয়নিকা: হ্যাঁ। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, পাছে তুমি বুঝে ফেলো যে তোমার এই অগোছালো কবিটাকে সামলাতে গিয়ে এই বাস্তববাদী মেয়েটা নিজেও কখন একটা আস্ত কবিতা হয়ে গেছে। (চয়নিকা উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্রর মুখোমুখি হলো) তুমি ভাবো আমি শুধু অংক চিনি ? তুমি কি জানো, প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে তোমার পাঠানো ওই দুই লাইনের কবিতাগুলো আমি কতবার করে পড়ি ? ওগুলো না পড়লে আমার ওই যান্ত্রিক মস্তিষ্কের অ্যালগরিদমগুলো কাজ করে না।

Read More : ভালোবাসার একনিষ্ঠ পাহারাদার । প্রেমের সংলাপ – ১২


রুদ্র: (মুচকি হেসে) তার মানে ম্যাডাম ডেটা সায়েন্টিস্ট গোপনে গোপনে কাব্যের চর্চাও করেন ?


চয়নিকা: কাব্য নয় রুদ্র, আমি তোমার পাগলামির চর্চা করি। তু্মি বলো চাঁদ বিষণ্ণ রাজপুত্র, আর আমি ভাবছি—চাঁদটা আসলে একটা আয়না, যাতে আমি আমার আর তোমার এই বৈপরীত্যের পূর্ণতা দেখতে পাই। এই যে তু্মি আমাকে নক্ষত্র গুনতে বললে, আমি আসলে নক্ষত্র গুনছিলাম না। আমি গুনছিলাম আমাদের জীবনের কতগুলো মুহূর্ত আমরা এই যান্ত্রিকতায় নষ্ট করেছি।


(চয়নিকা হঠাৎ রুদ্রর পাঞ্জাবির কোণটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে তার বুকের কাছে এসে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটায় তার কয়েকটা চুল রুদ্রর গালে এসে লাগল।)


চয়নিকা: শোনো কবি, তোর ওই ‘নীল কৃষ্ণচূড়া’ হয়তো বিজ্ঞানের বইতে নেই, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার চারপাশের পৃথিবীটা আসলেও নীল হয়ে গেছে। তোমার ওই অবাস্তব কথাগুলোই এখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় সত্যি। আমি চাই না কালকের গ্রাফ মেলাতে, আমি চাই না কোনো প্রজেক্ট রিপোর্ট। আমি শুধু চাই এই ছাদ, এই জ্যোৎস্না, আর তোমার ওই খামখেয়ালি শব্দগুলো।


রুদ্র: (গভীর আবেগে চয়নিকার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে) অবশেষে চয়নিকা তবে তার লজিক হারালো?

চয়নিকা: (রুদ্রর বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে) না রুদ্র, চয়নিকা আজ জীবনের শ্রেষ্ঠ লজিকটা খুঁজে পেয়েছে। আর সেটা হলো—অংকের হিসেবে যা শূন্য, ভালোবাসার হিসেবে তাই পূর্ণতা। তুমি আছো বলেই আমার এই পাথুরে পৃথিবীটা আজ জ্যোৎস্না হয়ে ঝরছে। তুমি কি আমায় আরও একবার ওই রাজপুত্রের গল্পটা শোনাবে ? কথা দিচ্ছি, এবার আর মাঝপথে কোনো ফিজিক্সের ল এনে বাগড়া দেব না। প্লিজ বলো না …


রুদ্র: (চয়নিকার কাঁধে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে) ওই দেখ, রাজপুত্র এবার হাসছে। কারণ সে আজ তার রাজকন্যাকে ফিরে পেয়েছে, যে কি না নক্ষত্র গুনতে গুনতে হৃদস্পন্দন গুনতে শিখে গেছে। হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ ………ওই শোনো …… বলছে ……ভালো আছি ভালো থেকো ……


চয়নিকা : (সুর করে গুনগুন করে) ভালো আছি ভালো থেকো , আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো………হুম হুম…


……………… সমাপ্ত………………

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *