ভালোবাসার একনিষ্ঠ পাহারাদার । প্রেমের সংলাপ – ১২ । রোমান্টিক বাংলা ডুয়েট সংলাপ

ভালোবাসার একনিষ্ঠ পাহারাদার । প্রেমের সংলাপ – ১২ । রোমান্টিক বাংলা ডুয়েট সংলাপ

প্রেমের সংলাপ – ১২
(রোমান্টিক বাংলা ডুয়েট সংলাপ)

লেখক – কিশোর মজুমদার

[রুদ্র এবং চয়নিকার প্রেম যেন এক বৈপরীত্যের মিলন। রুদ্র কবি, যার জগৎ জুড়ে শব্দ আর কল্পনা; অন্যদিকে চয়নিকা উচ্চশিক্ষিত, বাস্তববাদী এবং বুদ্ধিমতী। তাদের এই চিরচেনা মান-অভিমানের একটি কাল্পনিক সংলাপ নিচে দেওয়া হলো। ডুয়েট পাঠের জন্য এই রসসিক্ত সংলাপ একেবারে উপযুক্ত। ]

ভালোবাসার একনিষ্ঠ পাহারাদার

[ গঙ্গার পাড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। চয়নিকার পরনে নীল ঢাকাই শাড়ি, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ। রুদ্র সাদা পাঞ্জাবি আর জিন্সে একদম ক্যাজুয়াল, হাতে একটা পুরনো ডায়েরি। ভবিষ্যতের কথা উঠতেই দুজনের মধ্যে শুরু হলো সেই চিরচেনা দ্বন্দ্ব—বাস্তব বনাম কল্পনা।
ভবিষ্যতের ঘর: স্বপ্ন ও সংঘাত। ]

চয়নিকা: (গঙ্গার ওপারে তাকিয়ে) জানো রুদ্র, আমি মাঝে মাঝে আমাদের একটা ভবিষ্যতের ছবি দেখি। খুব সাধারণ একটা একতলা বাড়ি, শহরের কোলাহল থেকে দূরে, ঠিক কোনো গ্রামের প্রান্তে। বাড়ির সামনে একটা ছোট বাগান থাকবে, সেখানে কামিনী আর শিউলি ফুলের গাছ। এক্কেবারে সাধারণ ।

রুদ্র: (হেসে) তোমার মতো উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিমতী মেয়ে শেষমেশ শহর কাজ ব্যস্ততা সব ছেড়ে গিয়ে সংসার করবে ? এটা তো আমার লাইনের কথা হয়ে গেল চয়না ! তার চেয়ে তুমি না পিএইচডিটা কপমপ্লিট করে ওই কাজটাতেই জয়েন করে নাও।

চয়নিকা: (অভিমানের সুরে) তুমি কি ভাবো আমি শুধু ক্যারিয়ারই বুঝি ? আমারও তো একটা মন আছে। আমি চাই আমাদের সেই একতলা বাড়ির বারান্দায় বসে তুমি কবিতা লিখবে, আর আমি পাশে বসে তোমার কবিতার প্রুফ দেখব। ঘরে কোনো এসি থাকবে না, শুধু জানলা দিয়ে আসা দক্ষিণা বাতাস আর বর্ষার দিনে টিনের চালের শব্দ। তুমি কি চাও না এমন একটা জীবন ?

রুদ্র: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে তো অনেক তফাত। তুমি যে গ্রাম আর মাটির বাড়ির কথা বলছ, সেটা আমার কবিতার জগত। যেখানে ইন্টারনেট থাকবে না, তোমার রিসার্চের লাইব্রেরি থাকবে না। আর আমি? আমি তো বোহেমিয়ান। আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। আজ এখানে, কাল অন্য কোনো পাহাড়ের চূড়ায়। আমার ছন্নছাড়া জীবনে কি তুমি মানিয়ে নিতে পারবে ?

চয়নিকা: (একটু রেগে গিয়ে) এই তো তোমার সমস্যা! তুমি নিজেকে বোহেমিয়ান প্রমাণ করতে গিয়ে আমাকে সবসময় ‘সংসারী’ ছাঁচে ফেলে দাও। কেন, আমি কি তোমার সাথে পাহাড়ের চূড়ায় বসে আকাশ দেখতে পারি না? আমি বলতে চাইছি আমাদের একটা ফেরার জায়গা থাকবে। যেখানে সন্ধ্যায় শঙ্খ বাজবে, আর তুমি ডায়েরি নিয়ে বসলে আমি তোমার সঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলব— “রুদ্র, এই লাইনটা একটু বদলে দাও না!”

রুদ্র: (মৃদু হেসে) বাহ! চয়নিকা , মিস্টি মেয়েতা এবার কবির ওপর খবরদারি শুরু করল ! কিন্তু ভেবে দেখেছ, শুধু আকাশ-বাতাস আর প্রকৃতি দিয়ে তো চাল-ডাল কেনা যাবে না। সমাজ বলবে— “একজন মেধাবী মেয়ে একটা ভবঘুরে কবিকে বিয়ে করে জীবনটা নষ্ট করল।” সেই কথাগুলো কি নিতে পারবে?

চয়নিকা: (চোখ ছলছল করে) সমাজ কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি তোমার শব্দের শক্তি কতটা। তুমি হয়তো আমায় গয়না দিতে পারবে না, কিন্তু প্রতিদিন একটা করে নতুন কবিতা তো দিতে পারবে! আমার অভিমান তো সেখানে, যেখানে তুমি আমাকে তোমার কল্পনার অংশ করতে চাও না। তুমি কি সত্যিই চাও না আমাদের সেই মাটির পৃথিবীতে আমি তোমার পাশে থাকি?

রুদ্র: (চয়নিকার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে) পাগল মেয়ে! আমি তো ভয় পাই পাছে তোমার স্বপ্নগুলো আমার অভাবে ফিকে হয়ে যায়। আমি তো চাই আমাদের সেই বাড়ির ঘরভর্তি বই থাকবে, দেওয়ালে টাঙানো থাকবে রবীন্দ্রনাথের ছবি। জানলার পাশে একটা কাঠের টেবিল, যেখানে বসে আমি লিখব আর তুমি পাশের ঘরে তোমার গবেষণার কাজ করবে। মাঝেমধ্যে রাত জাগলে আমরা ছাদে গিয়ে তারা গুনব। কিন্তু বাস্তবটা যে বড় রুক্ষ চয়না !

চয়নিকা: (হাত সরিয়ে নিয়ে) বাস্তব রুক্ষ বলেই তো আমরা স্বপ্ন দেখি রুদ্র। তুমি কি চাও আমি অন্য কারোর হাত ধরি যে আমাকে একটা বড় ফ্ল্যাট দেবে, গাড়ি দেবে কিন্তু আমার মনের কথা বুঝবে না? তুমি কি চাও আমি প্রতিদিন অফিসের পর ফিরে এসে তোমার কবিতার বদলে কোনো বিজনেস রিপোর্ট পড়ি?

রুদ্র: (একটু নিস্তব্ধ থেকে) না, আমি তা চাই না। তোমার ওই উচ্চশিক্ষার তেজ আর কল্পনার মায়া—এই দুটোই তো আমার বাঁচার রসদ।

চয়নিকা: তবে কেন বারবার আমায় দূরে সরিয়ে দাও বাস্তবের দোহাই দিয়ে? আমাদের সেই একতলা বাড়িতে একটা পোষা বেড়াল থাকবে, আর বর্ষার দুপুরে আমরা দুজনে মিলে খিচুড়ি রান্না করব। তুমি বলবে বিরহী কবিতা, আর আমি বলব জীবনের জয়গান। এটাই তো আমার পূর্ণতা।

রুদ্র: (চয়নিকার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে) তুমি আজ আমায় নতুন করে প্রেমে ফেললে চয়ন। ঠিক আছে, তোমার সেই স্বপ্নের বাড়িতেই হবে আমাদের সংসার। আমি কথা দিচ্ছি, আমার কলম মাঝে মাঝে শুধুই আমাদের সেই নীল জানলা আর কামিনী ফুলের গন্ধ নিয়ে লিখবে। আমার কবিতার সম্রাজ্ঞী হয়ে তুমিই থাকবে সেই সংসারে।

চয়নিকা: (মুচকি হেসে) মনে থাকে যেন! আর হ্যাঁ, সেই বাড়িতে কিন্তু কোনো ইলেকট্রিক কলিং বেল থাকবে না। আমি দরজায় একটা কড়া লাগিয়ে দেব, তুমি যখনই বাইরে থেকে ফিরবে, ওই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনেই আমি বুঝে যাব কবি ফিরেছেন তার ঠিকানায়।

রুদ্র: (চয়নিকার কাঁধে মাথা রেখে) কবির ঠিকানা তো চিরকালই তোমার হৃদয়ে, চয়নিকা।

চয়নিকা: (খিলখিল হেসে) আর তোমার ঐ অগুনতি পাঠিকা ? ওদের কী হবে ? ওদের কোথায় রাখবে ?

রুদ্র: (চয়নিকার হাতে হাত রেখে) ওই যে বললাম কবির ঠিকানাটাই তো তোমার হৃদয়। অভিমান করে তাড়িয়ে দিলেও দেখবে তোমার হৃদয়ের দুয়ারে বসে গাইবো –
“খোলো খোলো দ্বার রাখিওনা আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে…………। [ দুজনে গুনগুন ]

………………………………………

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *